হোয়াটসঅ্যাপে তুলকালাম

বলা চলে, হোয়াটসঅ্যাপের যুগ চলছে। ‘হাই-হ্যালো’ থেকে গুরুত্বপূর্ণ কথাবার্তা সারা হচ্ছে স্মার্টফোনের জনপ্রিয় এ অ্যাপের মাধ্যমেই। দ্রুত পরিবর্তনের এ যুগে হোয়াটসঅ্যাপকে দ্রুত বার্তা আদান-প্রদান আর যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করেছে মানুষ। কিন্তু এর বিপরীত দিকটাও দেখা হয়ে গেল সবার। হোয়াটসঅ্যাপের অপব্যবহার মানুষের জন্য কতটা ভয়ংকর হয়ে উঠতে পারে, তারই চিত্র গত কয়েক মাসে ফুটে উঠল ভারতজুড়ে।

ইন্ডিয়া টুডের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভারত সরকারের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে দেশটিতে তুমুল জনপ্রিয় মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপ। অ্যাপটির তথ্য বা বার্তা আদান-প্রদানে নজরদারি চালানো সরকারের কাছে কঠিন সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। এর ফায়দা লুটতে শুরু করেছে দুর্বৃত্তরা। ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়েছে দেশটির বেশি কিছু অঞ্চলে। এরপর ছড়িয়ে দিচ্ছে সহিংস বার্তা। উত্তেজিত মানুষের হাতে ছেলেধরা সন্দেহে মারা পড়ছে অনেকেই।

ইন্ডিয়া টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, ছেলেধরা আতঙ্ক ভারতের পূর্ব থেকে পশ্চিম প্রান্তে ছড়িয়ে গেছে। মুম্বাই থেকে ৪০০ কিলোমিটার উত্তরে মহারাষ্ট্রের ধুলে জেলা। ১ জুলাই গুজবের জেরে মহারাষ্ট্রের ধুলে জেলায় পাঁচজনকে পিটিয়ে হত্যা করে গ্রামবাসী। এ ঘটনায় ১৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে পুলিশ। ধুলে জেলার রাইনপদা গ্রামে সাতজন অপরিচিত ব্যক্তি ঘোরাঘুরি করছিল। তারা এলাকার বাসিন্দাদের কাছে ভিক্ষা চাইছিল। এদিকে তার আগেই এলাকায় ছেলেধরা গুজব ছড়িয়েছিল। তাদের দেখেই আগুনে ঘি পড়ে। সন্দেহ গিয়ে পড়ে তাদের ওপর। এরপরই সাতজনকে ধরে ফেলে গ্রামবাসী। তাদের নিয়ে যাওয়া হয় একটি ঘরে। শুরু হয় গণপিটুনি। কিল, ঘুষি, লাথির সঙ্গে বাঁশ-লাঠি দিয়েও বেধড়ক পেটানো হয়। ঘটনাস্থলেই মৃত্যু হয় পাঁচজনের। দুজন পালাতে সক্ষম হয়। পরে পুলিশ গিয়ে পাঁচজনের মৃতদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়।

ধুলের ওই ঘটনা ভারতজুড়ে ঘটা সহিংস ঘটনার একটি উদাহরণ। এ ধরনের ঘটনায় কমপক্ষে ৩০ জন নিহত হয়েছে। পুলিশ জানায়, হোয়াটসঅ্যাপে একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে গুজব রটানো হচ্ছে যে বাইরে থেকে ছেলেধরার দল এসেছে। মেসেজগুলোর বয়ান মোটামুটি একই রকম, কিন্তু একেকটি এলাকায় সেগুলোকে অনুবাদ করে দেওয়া হচ্ছে। একটি ছোট ভিডিও জুড়ে দেওয়া হচ্ছে মেসেজের সঙ্গে। এ প্রক্রিয়ায় বার্তা ছড়ানোর কাজ গত ১০ মে শুরু হয়ে মহারাষ্ট্র থেকে ত্রিপুরা পর্যন্ত ছড়ায়। এখন পর্যন্ত গুজব ছড়িয়ে গণপিটুনি দেওয়ার ১৬টি ঘটনা ঘটেছে।

ইন্ডিয়া টুডের তাদের প্রতিবেদনে বলেছে, একটি প্ল্যাটফর্ম কাজে লাগিয়ে কীভাবে তাকে অস্ত্র বানিয়ে সারা দেশে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা যায়, তারই একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে হোয়াটসঅ্যাপের ঘটনাগুলো।

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ পবিত্রাণ রাজনের মতে, এটি কৌশলগত হুমকি। অস্ত্রের মতোই বিতর্কিত মিম তৈরি করে তা সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার কাজটি কৌশলে করা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত বা পরিকাঠামোগত সমস্যার চেয়েও বড় সমস্যা হলো অ্যাপটির এমন কিছু নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আছে, যা বদলানো অসম্ভব বা তথ্য আদান-প্রদানে প্রতি সেকেন্ডের নজরদারিও প্রায় অসম্ভব। সেটি কাজে লাগানো হচ্ছে। তাই ভবিষ্যতে এর চেয়ে আরও মারাত্মক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভুয়া তথ্য-অস্ত্র ব্যবহার করে বিশেষ করে ভুয়া ভিডিও ছড়ানো হতে পারে। ওই ভিডিওতে ভুয়া ফেস ম্যাপিং ও এআই টুল ব্যবহার করা হতে পারে। এর মাধ্যমে এমন দৃশ্য ফুটিয়ে তোলা সম্ভব, যা মানুষ কখনো বলেনি বা করেনি। এটি আরও মারাত্মক।

ভারতের কেন্দ্রীয় টেলিকম মন্ত্রণালয় এবং তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ও এ ব্যাপারে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে একমত। তা হলো দেশ, সমাজ ও নাগরিকদের নিরাপত্তার পক্ষে বিপজ্জনক হয়ে উঠছে হোয়াটসঅ্যাপ। দেশবিরোধী, উসকানিমূলক, জঙ্গি কাজকর্মসংক্রান্ত বিপজ্জনক বার্তা, তথ্য রুখে দেওয়ার কোনো উপায় হোয়াটসঅ্যাপে নেই। সরকারের পক্ষ থেকে চেষ্টা করা হচ্ছিল যাতে হোয়াটসঅ্যাপে লেনদেন হওয়া তথ্য, ছবি, ভিডিও যদি ফিল্টার বা সেন্সর করা যায়। কিন্তু মেসেজ এন্ড টু এন্ড এনক্রিপ্টেড হওয়ায় সেটার কোনো উপায় নেই। এ জন্য সরকার এমন কোনো কঠোর আইন আনতে চাইছে, যে আইনের নির্দেশে হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ বাধ্য থাকবে যেকোনো স্পর্শকাতর তথ্য বা বার্তা ভারত সরকার যখন চাইবে, তখনই সরকারকে শেয়ার করতে। ভারত সরকারের নির্দেশ বা আইন না মানলে হোয়াটসঅ্যাপকে নিষিদ্ধ করা হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, হোয়াটসঅ্যাপের মতো সামাজিক যোগাযোগের ওয়েবসাইটে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় (এমইআইটিওয়াই) ব্যবস্থা নিচ্ছে। ২ জুলাই ফেসবুকভিত্তিক ওই প্রতিষ্ঠানকে বিস্ফোরক বার্তা ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে লাগাম টানতে বলা হয়।

হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষও তাদের প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে মানুষ হত্যা করার ভয়ংকর পরিস্থিতি অনুধাবন করতে পেরেছে। হোয়াটসঅ্যাপের পক্ষ থেকেও ৪ জুলাই একটি বিবৃতিতে বলা হয়, সহিংসতার ঘটনাগুলো ভয়ংকর। এ ঘটনা প্রতিরোধে তারা বিভিন্ন সুরক্ষা ব্যবস্থা নিচ্ছে। ২০ জুলাই হোয়াটসঅ্যাপ জানায়, তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ভারতে হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটে একবারে পাঁচজনের বেশি মানুষকে কোনো কিছু ফরোয়ার্ড করা যাবে না। মিডিয়া মেসেজের পাশে থাকা কুইক ফরোয়ার্ড বাটনটিও সরিয়ে দেওয়া হবে।

হোয়াটসঅ্যাপের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের অন্য সব দেশের চেয়ে হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে ভারতীয়রা সবচেয়ে বেশি বার্তা, ছবি ও ভিডিও পাঠায়। হোয়াটসঅ্যাপের সবচেয়ে বড় বাজার ভারত। দেশটিতে ২০ কোটির বেশি মানুষ হোয়াটসঅ্যাপ ব্যবহার করে।

শুধু হোয়াটসঅ্যাপ নয়, বিশ্বজুড়ে ইউটিউব ও ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের প্ল্যাটফর্মগুলোয় ভুয়া খবর ছড়ানো ঠেকাতে ও প্রাইভেসি রক্ষার গুরুত্ব দিতে চাপ বাড়ছে। এ কারণগুলো দেখিয়ে পশ্চিম এশিয়ার কয়েকটি দেশে হোয়াটসঅ্যাপের ভয়েস ও ভিডিও কলিং নিষিদ্ধ। চীনে ফেসবুক ও হোয়াটসঅ্যাপ দুটোই নিষিদ্ধ। ১১ জুলাই যুক্তরাজ্যের তথ্য কমিশনার অফিস থেকে ফেসবুককে কেমব্রিজ অ্যানালিটিকা কেলেঙ্কারির জন্য পাঁচ লাখ মার্কিন ডলার জরিমানা করা হয়েছে। সচেতন থাকার কথা বলেছে গুগল। গত মার্চে গুগল জানায়, ভুয়া খবর ঠেকাতে ও সাংবাদিকতার মান উন্নত করতে গুগল নিউজ ইনিশিয়েটিভ হিসেবে ৩০ কোটি ডলার খরচ করা হবে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, হোয়াটসঅ্যাপের পক্ষ থেকে ভুয়া বার্তা পাঠানোর বিষয়ে কিছু ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। ব্যবহারকারীরা যাতে যোগাযোগ ছাড়া তাদের মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহার করে সহিংসতা ছড়াতে না পারে, সে ধরনের ফিচার পরীক্ষা চালাচ্ছে।

হোয়াটসঅ্যাপ কর্তৃপক্ষ বলছে, ব্যবহারকারীর হাতে নিয়ন্ত্রণ রাখার সুবিধার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি জনসচেতনতার তৈরিতে প্রচারমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে তারা। তারা পত্রিকায় বিজ্ঞাপন ছাড়াও নানা উপায়ে মানুষকে সচেতন করবে। এ মাসের শুরুর দিকে অবশ্য হোয়াটসঅ্যাপ বলেছিল, তাদের প্ল্যাটফর্মে ভুয়া খবর ঠেকাতে সরকার ও সাধারণ মানুষের যৌথ প্রচেষ্টা দরকার। সবাই মিলে এগিয়ে এলে এ ধরনের দুর্বৃত্তপনা দূর করা সম্ভব।

-প্রথম আলোতে লিখেছেন মো. মিন্টু হোসেন।